কিডনি রোগে আক্রান্ত কিশোরের কাঁধে পাঁচজনের সংসার

কিডনি রোগে আক্রান্ত কিশোরের কাঁধে পাঁচজনের সংসার

মাত্র ১৪ বছর বয়স। এই বয়সে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা থাকলেও জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাকে বসিয়েছে অটোভ্যানের চালকের আসনে। জন্মের পর থেকেই কিডনিজনিত জটিল রোগে ভুগছে হৃদয় শেখ।

দীর্ঘদিন চিকিৎসার অভাবে শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে, ওজন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪ কেজিতে। তবুও নিজের অসুস্থতা ভুলে পরিবারের পাঁচ সদস্যের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন ভাড়ার অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সে।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের চৌদুয়ার গ্রামের সুজাব আলী শেখ ও আমেনা খাতুন দম্পতির বড় ছেলে হৃদয়। একসময় কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন বাবা সুজাব আলী। কিন্তু ছয় বছর ধরে ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন কার্যত শয্যাশায়ী। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হয়ে উঠেছে কিশোর হৃদয়।

প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভাড়ায় নেওয়া অটোভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামলেও এখন যাত্রী সংকটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন মোড়ে অপেক্ষা করতে হয় তাকে। যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে সংসার। সেই অর্থ থেকেই বাবার ওষুধ, পরিবারের খাবার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, হৃদয়ের পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। হৃদয়ের কিডনি রোগের যথাযথ চিকিৎসা অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে আছে। একইভাবে বাবার চিকিৎসাও নিয়মিত করানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিবারটি দিন দিন আরও অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

হৃদয় শেখ বলেন, ‘কিডনির সমস্যার কারণে আমার শরীর অনেক ফুলে গেছে। এখন আমার ওজন ১০৪ কেজি। পায়ে ঠিকমতো ভর দিতে পারি না, পা বাঁকা হয়ে গেছে। খুব কষ্ট হয়। চিকিৎসা করাতে পারছি না। বাবাও অনেক অসুস্থ। আমাকে রেখে যদি বাবা মারা যান, সেটা আমি সহ্য করতে পারব না। কিন্তু বাবার চিকিৎসা করানোর মতো আমাদের কোনো সামর্থ্য নেই।’

হৃদয়ের মা আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী ছয়-সাত বছর ধরে ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন। মাঝেমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। কিছুদিন ভালো থাকলেও আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত দুই-তিন বছর ধরে তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। আমার বড় ছেলের ছোটোবেলা থেকেই কিডনির সমস্যা। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছিলাম, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন ছেলে যা আয় করে, অটোভ্যানের ভাড়া দেওয়ার পর যা থাকে, তা দিয়ে সংসারই চলে না। দুইজনের ওষুধ কিনতে হয়। অনেক সময় অন্যের বাড়ি থেকে শাক-সবজি এনে রান্না করে দিন পার করতে হয়। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা পেলে হয়তো আমার স্বামী ও ছেলে চিকিৎসা করাতে পারবে।’

হৃদয়ের বাবা সুজাব আলী বলেন, ‘আমি আগে কৃষিকাজ করতাম। কিন্তু ছয় বছর ধরে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত। এখন আর কাজ করতে পারি না, রোদেও বের হতে পারি না। আগে অটোভ্যান চালাতাম, এখন সেটাও বড় ছেলে চালায়। আমার ছেলেও কিডনির রোগে ভুগছে। টাকার অভাবে ওর চিকিৎসা করাতে পারছি না, নিজের চিকিৎসাও হচ্ছে না। ছেলে যা আয় করে, ওষুধ কিনে অনেক সময় একবেলা খেয়ে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। আমাদের বাঁচতে সবার সহযোগিতা দরকার।’

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *