চাঁদা বকেয়ার অভিযোগে গোরস্থানে দাফন হলো না নাসির উদ্দিনের

চাঁদা বকেয়ার অভিযোগে গোরস্থানে দাফন হলো না নাসির উদ্দিনের

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের পুরাতন আজমপুর এলাকায় চাঁদা বকেয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তির মরদেহ স্থানীয় গোরস্থানে দাফন করতে না দেওয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

gnewsদৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
পরিবারের অভিযোগ, আজমপুর পুরাতন পাড়া গোরস্থানের চাঁদা না দেওয়ার কারণে প্রথমে তাদের কাছে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দাফনের অনুমতি মেলেনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ভোর ৫টার দিকে মো: নাসির উদ্দিন মারা যান। তার কোনো ছেলে সন্তান নেই, তিন মেয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা তড়িঘড়ি করে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। পথেই তাদের কাছে খবর আসে, যে গোরস্থানে তাদের দাদা ও পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে, সেখানে নাসির উদ্দিনকে দাফন করতে দেওয়া হচ্ছে না।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথমে তাদের বলা হয়, নাসির উদ্দিন দীর্ঘদিন গোরস্থানের মাসিক বা বাৎসরিক চাঁদা পরিশোধ করেননি। তাই এককালীন ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরে তারা জানিয়ে দেন, হাতে যত টাকা আছে তা দিয়ে বাকি টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করবেন। এমনকি ২ থেকে ৩ কিস্তিতে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন বলে দাবি করেন তারা। কিন্তু তাতেও রাজি হননি গোরস্থান কমিটির সভাপতি আবুল মাস্টার।

মৃতের বড় মেয়ে মোছা. নাসিমা খাতুন বলেন, আমরা তিন বোন ঢাকায় থাকি। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে দ্রুত বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। পথে চাচাতো ভাই ফোন করে জানায়, যেখানে আমাদের দাদা ও পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে সেখানে বাবাকে দাফন করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রথমে বলা হয় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা লাগবে। আমরা টাকা দিতে রাজি ছিলাম, প্রয়োজনে কিস্তিতেও দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে বলা হয়, কোনো টাকা দিলেও বাবাকে সেখানে দাফন করা হবে না। একজন মৃত মানুষকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া খুব কষ্টের।

এদিকে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। স্থানীয়রা জানান, নাসির উদ্দিনের বাবা মৃত আহমদ আলী ওই গোরস্থানের সদস্য ছিলেন এবং তাকে সেখানেই দাফন করা হয়েছিল। তাই নাসির উদ্দিনের পরিবারও স্বাভাবিকভাবেই একই গোরস্থানে দাফনের আশা করেছিল।

মৃতের বাড়ির সামনে থাকা মুদি দোকানি মো. সেলিম বলেন, নাসিরের বাবা ওই গোরস্থানের সদস্য ছিলেন। তার কবরও সেখানে আছে। নাসির মারা যাওয়ার পর তার বড় মেয়ে সভাপতি আবুল মাস্টারের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বলেন, যত টাকা লাগে দেবেন, শুধু বাবাকে দাফন করতে দিতে হবে। কিন্তু তারপরও অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে আশা মেম্বার তার পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করেন।

সদরপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও বিএনপির ওয়ার্ড সেক্রেটারি আশরাফুল হক আশা বলেন, নাসির উদ্দিনের বাবা নিয়মিত চাঁদা দিতেন। তার মৃত্যুর পর নাসির আর চাঁদা দেয়নি। কিন্তু মৃত্যুর পর তার পরিবার এককালীন টাকা দিতেও রাজি হয়েছিল। শুনেছি তখন প্রায় ৪৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে বলা হয়, টাকা লাগবে না, তবুও তাকে দাফন করা হবে না। তখন মানবিক দায়িত্ব থেকে আমি আমার পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করি।

তিনি আরও বলেন, কবর অর্ধেক খনন হওয়ার পর এলাকার কয়েকজন জামায়াতের নেতা কর্মী এসে বলেন, এতে তাদের দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং মরদেহ অন্য গোরস্থানে নেওয়া হোক। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা বলেন, যেখানে কবর খোঁড়া হয়েছে সেখানেই দাফন করা হবে। মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা কবরস্থান। এটি নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি হওয়া দুঃখজনক।

ঘটনার পর এলাকায় গুঞ্জন ছড়ায়, স্থানীয় জামায়াত নেতা আতিয়ার হাজীর ইন্ধনেই গোরস্থান কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নেয়। কারণ হিসেবে কেউ কেউ বলেন, নাসির উদ্দিনের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভালো সম্পর্ক ছিল। যদিও তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন না।

আতিয়ার হাজী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নাসির উদ্দিন আমার চাচাতো ভাই। তাকে ওই গোরস্থানে দাফন করতে না দেওয়ার কথা শুনে আমি বরং সেখানে দাফনের চেষ্টা করেছি। আমি গোরস্থান কমিটির কেউ নই। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং আমি বহুবার গোরস্থান কর্তৃপক্ষের এমন নীতির সমালোচনা করেছি।

অন্যদিকে গোরস্থান কমিটির সভাপতি আবুল মাস্টার বলেন, আমাদের গোরস্থানে প্রায় ১৪০ জন সদস্য রয়েছে। কেবল সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এখানে দাফন করা হয়। নাসির উদ্দিন সদস্য ছিলেন না। তাই তাকে দাফনের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ৩৫-৪৫ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ সঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন, সদস্যরা কেউ ৫০০ টাকা, কেউ ১ হাজার টাকা, আবার কেউ ধান দিয়ে চাঁদা পরিশোধ করেন। গোরস্থানের জায়গা সীমিত। সবাইকে দাফন করতে দিলে দ্রুত জায়গা ফুরিয়ে যাবে।

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সাধারণ গোরস্থানে দাফনের জন্য চাঁদা বাধ্যতামূলক করা কতটা যুক্তিসংগত এবং একজন মৃত ব্যক্তিকে পূর্বপুরুষদের পাশে দাফনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা মানবিকতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, সাধারণত জনসাধারণের ব্যবহৃত গোরস্থানে এ ধরনের নিয়ম থাকে না। তবে যদি এটি সম্পূর্ণ পারিবারিক গোরস্থান হয়, তাহলে আলাদা বিষয়। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *