ঢাকার কলাবাগানের ক্রিসেন্ট রোডে একই পরিবারের দুই নারীকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁদের জামাতা শিপন। পুলিশ বলছে, পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে ঘটনার আগের কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, কে কী দেখেছেন এবং কীভাবে হত্যার পর অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, তা নিয়ে সামনে এসেছে বেশ কিছু তথ্য। রোববার সকাল। রাজধানীর কলাবাগানের ক্রিসেন্ট রোডের ৫৫/২ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাট।
কিছুক্ষণ আগেও সেখানে ছিল একটি পরিবারের স্বাভাবিক ব্যস্ততা। এর মধ্যেই পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় হত্যাকাণ্ড।
ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ২১ বছর বয়সী ফারজানা বেগমের মরদেহ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাঁর মা ফিরোজা বেগমকে। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁরও মৃত্যু হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় ফারজানার স্বামী শিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একটি পারিবারিক বিরোধ কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে দুই নারীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল?
গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার পরের সকাল
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিপন, তাঁর স্ত্রী ফারজানা, শাশুড়ি ফিরোজা বেগম এবং শ্বশুর ফারুক হোসেন সম্প্রতি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার বটগাঁওয়ে গিয়েছিলেন।
সেখানে পরিবারের এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। শনিবার রাতে তাঁরা ঢাকায় ফিরে আসেন। পরদিন সকালেই ঘটে হত্যাকাণ্ড।
ভবনটির কেয়ারটেকার বজলুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৯টার দিকে ফারুক হোসেন তাঁর পরিবার নিয়ে বাসায় ফেরেন। এরপর সকালে ফ্ল্যাটে পাওয়া যায় ফারজানার মরদেহ।
ঝগড়া থেকে হত্যাকাণ্ড
কলাবাগান থানা সূত্র বলছে, ফারজানা ও শিপনের বিয়ে হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। বিয়ের পর থেকেই তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পারিবারিক কলহ চলছিল।
রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিপন বাসায় গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
একপর্যায়ে রান্নাঘর থেকে ধারালো ছুরি এনে তিনি স্ত্রীকে আঘাত করেন। পরে মেয়েকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে শাশুড়ি ফিরোজা বেগমও হামলার শিকার হন।
পুলিশের দাবি, দুজনকেই গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করা হয়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী নিয়ে বিরোধ হয়েছিল, তা এখনো বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি।
ঘটনার সময় কে কোথায় ছিলেন?
এই হত্যাকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঘটনার সময় পরিবারের সবাই একই জায়গায় ছিলেন না। নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফারুক হোসেন তখন বাসার বাইরে ছিলেন।
ফারুকের এক পরিচিত মাসুম বিল্লাহ জানান, ফারুকের ছোট ছেলে ঘটনার সময় ভয় পেয়ে ছাদে উঠে পাশের ফ্ল্যাটে যায়। সেখানে সে পরিবারের সদস্যদের খবর দিতে বলে যে তার মা ও বোনকে হত্যা করা হচ্ছে। এরপর খবর পেয়ে ফারুক দ্রুত বাসায় ফিরে আসেন।
বাসায় গিয়ে তিনি মেয়েকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। স্ত্রী ফিরোজা তখনো গুরুতর আহত ছিলেন। তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, হত্যাকাণ্ডের সময় ফ্ল্যাটে থাকা পরিবারের অন্য সদস্যরাও ঘটনার কিছু অংশ প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য এসেছে।
ছুরি হাতে ফ্ল্যাটে ঢোকার অভিযোগ
ঘটনার আগে ও পরে শিপনের চলাফেরা নিয়েও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ফারুকের এক প্রতিবেশী নারী জানান, সকালে বাজারে যাওয়ার সময় তিনি এক তরুণকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে সাইকেল তালাবদ্ধ করতে দেখেছিলেন। তাঁর কোমরে একটি ছুরি ছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি ফারুকের জামাতা শিপন।
আরেকজন রিকশাচালকের বরাত দিয়ে ওই নারী বলেন, শিপনকে কোমরে ছুরি নিয়ে দ্রুত ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেখা হয়েছিল। তবে এই প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
শিশুকে সঙ্গে নিয়ে পালানোর চেষ্টা
হত্যাকাণ্ডের পর শিপন তাঁর এক বছরের শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ তাঁর অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। রোববার বিকেল ৫টার দিকে কলাবাগান থানা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, তাঁর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে।
কলাবাগান থানার ওসি মো. ফজলে আশিক জানিয়েছেন, শিপন হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক কলহের কথা বলা হলেও ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট এখনো পরিষ্কার নয়।
তদন্ত এখন কোন দিকে?
পুলিশ জানিয়েছে, শিপনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে তারা।
তবে কোনো আসামির স্বীকারোক্তি একাই ঘটনার সবকিছু প্রমাণ করে না। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পুলিশকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং অন্যান্য প্রমাণ মিলিয়ে দেখতে হবে।
এখন পর্যন্ত পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য হলো, পারিবারিক বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড।
তবে একটি পরিবারের দুই নারীকে একই ঘটনায় প্রাণ হারাতে হলো কেন, সেই বিরোধ কতদিনের এবং হত্যাকাণ্ডের আগে পরিস্থিতি কীভাবে চরমে পৌঁছেছিল, তার পূর্ণ উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হওয়ার পরই।

