কেন একমাত্র মেয়েকে খুন করলেন বাবা-মা

কেন একমাত্র মেয়েকে খুন করলেন বাবা-মা

জন্মদাতা পিতা ও গর্ভধারিণী মা যখন আদরের একমাত্র সন্তানকে নিজ হাতে হত্যা করেন, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম নিষ্ঠুরতার প্রকাশ ঘটে। এমনই এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে খুলনায়, যা এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

খুলনা সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী আরফান হোসেন নির্জনাকে (১৭) হত্যা করেছেন তার মা ও বাবা। হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা।

মেয়ের খুনি মা-বাবা
পারিবারিক কলহের জেরে মেয়েকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মা সীমা আক্তার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। একই ঘটনায় অভিযুক্ত নিহতের বাবা মোহাম্মদ আলী হোসেন আকাশ পলাতক রয়েছেন।

তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে শনিবার (১১ জুলাই) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, গত ৮ জুলাই রাত প্রায় ৯টার দিকে সদর থানা এলাকার একটি আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়ক থেকে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করে। পিবিআই, সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রচার এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় সদর থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। তদন্তের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়। নিহত আরফান হোসেন নির্জনা সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা, সে মোহাম্মদ আলী হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সীমা দম্পতির একমাত্র সন্তান।

কেএমপি কমিশনার জানান, নিহতের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রথমদিকে তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সীমা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। এরপর ১০ জুলাই অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে সদর থানা পুলিশ।

মেয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং একাধিকবার বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন মা-মেয়ের মধ্যে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সীমা মেয়েকে মারধর করেন। পরে পাশের কক্ষ থেকে এসে বাবা আকাশ কাঠের একটি বাটা দিয়ে আঘাত করলে সেটি কিশোরীর মাথায় লাগে। এতে গুরুতর আহত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।

পুলিশের দাবি, মৃত্যুর পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে মরদেহটি প্রথমে কাপড়ে মুড়িয়ে পরে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে সদর থানা এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে রাখা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় সীমা স্বেচ্ছায় আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের বাবা আকাশকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তার অবস্থান শনাক্তে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে তদন্তে নিহতের বাবা-মায়ের মাদক সেবনের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিষয়টি এখনও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

নির্জনা হত্যার কারণ
পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তেরখাদা উপজেলার আজগড়া এলাকার এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে করায় নির্জনার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তার মা-বাবা। গত ২১ এপ্রিল নির্জনা স্বেচ্ছায় তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান রনিকে বিয়ে করেন। এর ১৭ দিন পর তাকে বুঝিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। ঘটনার দিন সকালেও মেয়েটি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলে তাকে আবারও বুঝিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু বিকেলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ জানিয়েছে, নির্জনা অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন পালিয়ে এক বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করে। কিছুদিন সেখানে থাকার পর আবার বাড়িতে ফিরে আসে। পরে একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটে। সম্প্রতি রনি নামের যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যায়। সেখানে তিন দিন থাকার পর বাড়িতে ফোন করে জানায়, সে রনিকে বিয়ে করেছে। এরপর সেখান থেকেও কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে আসে। এসব বিষয় নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে কলহ চলছিল।

মেয়েকে হত্যা করে গুমের চেষ্টা
একমাত্র সন্তান নির্জনার মৃত্যুর পর ঘাতক পিতা আকাশ ও মা সীমা চরম অস্থির হয়ে পড়েন। লোকলজ্জা ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তারা তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতরেই নির্জনার মরদেহের হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে ফেলেন। এরপর রাতের আঁধারে সুবিধাজনক সময়ে সেই বস্তাবন্দি মরদেহ নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে দিয়ে দুজনই পালিয়ে যান। লাশ বস্তাবন্দি করা ও গুমের চেষ্টার পুরো প্রক্রিয়ায় ঘাতক স্বামীকে সরাসরি সহযোগিতা করেন মা সীমা।

ঘটনার পরপরই পরিচয় শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পিবিআই, সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় তদন্ত চালানো হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতের ছবি প্রকাশ, বেতার বার্তা প্রচার এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ১০ জুলাই খুলনা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

বৃহস্পতিবার মর্গে গিয়ে সীমা সাংবাদিকদের কাছে মেয়ের বিয়ে ও চিঠি লিখে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে পুরো দায় নির্জনার সাবেক স্বামীর ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন।

সীমা জানান, চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নির্জনা তেরখাদা উপজেলার পালেরহাট আজগড়া গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রনির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। ১৭ দিন পর তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও ওই যুবক নির্জনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তার দাবি, রনিই কৌশলে নির্জনাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রেখে গেছে।

তিনি আরও জানান, এর আগে ফকিরহাট উপজেলার বারইপাড়া এলাকার আরেক যুবকের সঙ্গেও নির্জনার বিয়ে হয়েছিল। তবে সেখানে মাত্র একদিন থাকার পর সে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে। মায়ের দাবি অনুযায়ী, বুধবার সকালে নির্জনা বাড়ি থেকে বের হলে তাকে ডেকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু দুপুরে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকাকালে সবার অজান্তে সে আবার বের হয়ে যায়। এর আগে নির্জনা একটি চিঠিও লিখেছিল, যেখানে তাকে খোঁজাখুঁজি না করার কথা উল্লেখ ছিল।

পারিবারিক কাঠামো ভেঙে বাড়ছে নিষ্ঠুরতা
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে তরুণ প্রজন্ম অল্প বয়সেই অতিরিক্ত পরিণত আচরণ করছে। বর্তমানে সমাজে মাদকাসক্তি ও অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। আগের মতো পারিবারিক বন্ধনও আর নেই। একক পরিবার বেড়েছে। আগে পরিবারে কোনো সমস্যা হলে সবাই মিলে তা সমাধানের চেষ্টা করত। এখন পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরেও খুনের মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আজকাল মোবাইলে আমরা ভালো কিছুর চেয়ে খারাপ বিষয়ই বেশি দেখি। এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ছে। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি কিশোরী একাধিক বিয়ে করছে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিচ্ছে, এটি সামাজিক অধঃপতনেরই বার্তা।’

তিনি বলেন, ‘সন্তান কোন পথে যাচ্ছে, সে বিষয়ে যেমন অভিভাবকদের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অভিভাবকরাই যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন, তখন তাদের দায়িত্ববোধও কমে যায়। আর তখনই এ ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে।’

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বাংলানিউজকে বলেন, ‘খুন বা সহিংসতার অন্যতম কারণ হলো পারিবারিক কাঠামো ভেঙে যাওয়া এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব। শহরে সমাজ বা কমিউনিটি বলে কার্যত কিছুই গড়ে ওঠেনি। মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা অনেক সময় মানুষকে হিংস্র ও নিষ্ঠুর করে তোলে। মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতা কমে গেছে। আগের তুলনায় মানুষ বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ায় পারিবারিক সহিংসতাও বেড়েছে। মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা যখন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই মা-বাবার হাতে সন্তান হত্যার মতো ঘটনা ঘটে।’

তার মতে, ‘বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নীতি-নৈতিকতার চর্চা অত্যন্ত জরুরি।’

দ্য ফিউচার আইডিয়াল মাদার অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘বাবা-মা সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, যখন তারাই কোনো কারণে নিজের সন্তানকে হত্যা করেন, তখন তা গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একটি শিশু পৃথিবীতে আসে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্নেহ পাওয়ার অধিকার নিয়ে। কিন্তু যখন সেই শিশুটি নিজের পরিবারের মধ্যেই নির্যাতন বা মৃত্যুর শিকার হয়, তখন এটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজ, মানবতা এবং বিবেকেরও ব্যর্থতা ‘

তিনি বলেন, ‘কোনো অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক কলহ, মানসিক চাপ কিংবা সামাজিক সমস্যা কখনোই একটি জীবন কেড়ে নেওয়ার ন্যায্যতা হতে পারে না। প্রতিটি সন্তানের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার রক্ষা করা বাবা-মা, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব।’

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘নির্জনার অল্প বয়সে একাধিক বিয়ে ও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার দায়ভার থেকেও মা-বাবা নিজেদের মুক্ত রাখতে পারেন না। তাদের উচিত ছিল একমাত্র মেয়েকে সঠিক শিক্ষা দেওয়া, তার চলাফেরা ও মানসিক অবস্থার প্রতি নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া। একজন সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তাকে শাস্তি নয়, বরং বোঝানো, কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা প্রয়োজন ছিল।’

তার মতে, ‘এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা। পরিবারে পারস্পরিক আস্থা, নৈতিক শিক্ষা, সহনশীলতা এবং সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কোনো সন্তান আর নিজের ঘরেই অনিরাপদ হয়ে না পড়ে।’

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *