পালিয়ে থেকেও ৬ মাসের বেতন পেলেন আ.লীগ নেত্রী

পালিয়ে থেকেও ৬ মাসের বেতন পেলেন আ.লীগ নেত্রী

অভিযুক্ত শাহনাজ বিউটি উপজেলার ভাংনী আদমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির সভানেত্রী।

জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করা, নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, শিক্ষাগত সনদে অসংগতির অভিযোগ এবং অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

বিস্তারিত জানতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তর, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট মাদরাসার বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব নথিতে শাহনাজ বিউটির নিয়োগ, চাকরির অবস্থা, বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত একাধিক তথ্য উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, শাহনাজ বিউটি ২০০৩ সালের ১ মার্চ ভাংনী আহমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তার নিয়োগের আগে ২০০২ সালের আগস্টে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং নির্ধারিত ফলাফলের শর্ত উল্লেখ ছিল। তবে তার স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফল তৃতীয় বিভাগ হওয়ায় তৎকালীন যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

আরও জানা গেছে, ২০০৮ সালের পর শাহনাজ বিউটি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির নেতৃত্বে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পর থেকে তিনি নিয়মিত মাদরাসায় ক্লাস নিতেন না। বরং বেতন উত্তোলনের সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তার কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আসতেন। ফলে ইংরেজি বিভাগের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সময় তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ২০২৩ সালে নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণের পর। ওই বছর শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে গভর্নিং বডি প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দুটি পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও শাহনাজ বিউটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটি নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদে অসংগতি, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ আটটি বিষয় উল্লেখ করে তাকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গভর্নিং বডি তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। পরদিন দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহনাজ বিউটির বিরুদ্ধে দুটি মামলার তথ্যও নথিতে পাওয়া গেছে। একটি মামলায় তাকে হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এবং অন্যটিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামি করা হয়েছে। তবে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলছে।

এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শাহনাজ বিউটি এক দিনের জন্য মাদরাসায় যান বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সেদিন তিনি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করেই চলে যাওয়ার সময় অধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষক তাকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ জানান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তিনি অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সাবেক অধ্যক্ষসহ কয়েকজনকে সাক্ষী করা হয়। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শাহনাজ বিউটির নামে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের বেতন ছয় মাস বন্ধ থাকে। এ দিকে বেতনের জন্য সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম হাইকোর্টে রিট করলে, জরুরি ভিত্তিতে বেতন-ভাতা প্রদানের আদেশ প্রদান করেন আদালত। এ সময় সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম আওয়ামী লীগ নেত্রী শাহনাজ বিউটির সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতির তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে বেতন শিটে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে নাম দাখিল করে তার ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন।

—

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *