বাবার মর\দেহ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষা, লাবিব পেল গোল্ডেন জিপিএ-৫

বাবার মর\দেহ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষা, লাবিব পেল গোল্ডেন জিপিএ-৫

বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষার শেষ বিষয়ে অংশ নেওয়া নোয়াখালীর শিক্ষার্থী আবতাহি উদ্দিন লাবিব গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে গভীর শোককে শক্তিতে পরিণত করে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সে। তার এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে ২৩৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১৩১ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদেরই একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবতাহি উদ্দিন লাবিব। সে সব বিষয়ে এ-প্লাস পেয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।

এর আগে গত ২০ মে জীববিজ্ঞান পরীক্ষার দিন বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখেই পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়েছিল লাবিব। ওই দিনই ছিল তার এসএসসি পরীক্ষার শেষ বিষয়। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবার জানাজা ও দাফনে অংশ নেয় সে। ঘটনাটি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

জানা যায়, লাবিবের বাবা মফিদুল আলম চাটখিল মহিলা ডিগ্রি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। গত ১৯ মে রাতে ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানের ভালো ফলাফল ও উচ্চশিক্ষা ছিল মফিদুল আলমের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই গভীর শোকের মধ্যেও পরীক্ষায় অংশ নেয় লাবিব। আজকের এই ফলাফল বাবার প্রতি তার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ।

লাবিবের এই সাফল্যে নোয়াখালীর শিক্ষাঙ্গনে প্রশংসার পাশাপাশি আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার এই অর্জন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য সাহস ও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফলাফল প্রকাশের পর লাবিব বলেন, বাবা সব সময় চাইতেন আমি ভালো ফল করি। পরীক্ষার সময় বাবাকে হারানো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। আজ গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছি, কিন্তু বাবা পাশে নেই। তিনি ফলাফল পেলে খুব খুশি হতেন।

এদিকে লাবিব ফলাফল প্রকাশের পর নিজের ফেসবুকেও বাবাকে স্মরণ করে আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছে। সেখানে সে লিখেছে, আজকের দিনে যদি আমার বাবা বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো নিজের আইডি থেকে পোস্ট করে বলতেন— আমার ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সে আরও লিখেছে, ভালো রেজাল্ট হওয়ার পরেও মনের মধ্যে কেমন যেন এক নীরব ব্যথা কাজ করছে। আপনারা সবাই আমার জন্য, আমার বাবার জন্য এবং আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন। মহান আল্লাহ যেন আমার বাবাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন এবং আমি যেন বড় হয়ে আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।

লাবিবের আবেগঘন স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শুভকামনা জানান। শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার এই সাফল্যকে প্রয়াত বাবার স্বপ্ন পূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন।

নোয়াখালী জিলা স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, লাবিব শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। ব্যক্তিগত জীবনের এত বড় শোককে জয় করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করা তার অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়।

চাটখিল মহিলা ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ ফারুক সিদ্দিকী ফরহাদ বলেন, মফিদুল আলমের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল সন্তানের সাফল্য। লাবিবের এই অর্জন নিঃসন্দেহে তার বাবার স্বপ্ন পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

চাটখিল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, লাবিবের এই সাফল্য শুধু ভালো ফলাফল নয়, এটি অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ ও মানসিক শক্তির অনন্য উদাহরণ। বাবাকে হারানোর গভীর শোকের মধ্যেও তার ধৈর্য ও সাহস অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *