বিমান হামলায় বাবাকে হারিয়েও ফিলিস্তিনের বোর্ড পরীক্ষায় সেরা গাজার সাবা

বিমান হামলায় বাবাকে হারিয়েও ফিলিস্তিনের বোর্ড পরীক্ষায় সেরা গাজার সাবা

তবে যুদ্ধ, স্বজন হারানোর বেদনা ও বারবার বাস্তুচ্যুতির মতো পাহাড়সম প্রতিকূলতাও তাকে দমাতে পারেনি। সব বাধা জয় করে ফিলিস্তিনের জাতীয় মাধ্যমিক পরীক্ষায় (তাওজিহি) বিজ্ঞান বিভাগে দেশসেরা হয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজার এই অদম্য তরুণী। পরীক্ষায় তার প্রাপ্ত নম্বর ৯৯.৯ শতাংশ।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনে এবারই প্রথম তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। গত জুনে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষার্থী ছিল ২৫ হাজারের বেশি।

যুদ্ধের ভয়াবহতায় গাজার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। টিকে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি স্কুল এখন বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু আজ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।

অভাবনীয় এই সাফল্য সাবা তার মা, ভাইবোন, শিক্ষক এবং বিশেষ করে তার প্রয়াত বাবা ফায়েদ রাবাহকে উৎসর্গ করেছেন। তার বাবা জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা আনরওয়ার (UNRWA) একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। দুর্ভাগ্যবশত, ২০২৪ সালের জুনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি প্রাণ হারান। এর আগে জানুয়ারি মাসে আল-মাগাজি ক্যাম্পে তাদের নিজেদের বাড়িটিও গুঁড়িয়ে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। ফলে পরিবারটিকে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

ফলাফল ঘোষণার পরপরই আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে সাবার পরিবার ও প্রতিবেশীরা বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠেন। সমাবর্তনের গাউন পরা সাবাকে ঘিরে স্থানীয় তরুণরা ড্রাম বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন, আর প্রতিবেশীরা তাকে ফুল দিয়ে উষ্ণ অভিনন্দন জানান।

তবে ঘরের দেয়ালে ঝোলানো নিহত বাবার ছবির নিচে দাঁড়িয়ে সাবার এই আনন্দ উদযাপন যেন গভীর শোকের মাঝেই এক আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিল।

সাবার এই সাফল্যের পেছনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। বারবার মাথা গোঁজার ঠাঁই বদলানোর কারণে তার অর্ধেক বই-খাতাই হারিয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট না থাকায় বাধ্য হয়ে মায়ের মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বেলে রাতের পর রাত পড়াশোনা করেছেন তিনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাইভেট পড়তে ও পরীক্ষায় অংশ নিতে তাকে অন্য এলাকায় ছুটতে হয়েছে। পথে যেকোনো মুহূর্তে ভয়ংকর কিছু ঘটে যাওয়ার আতঙ্ক সবসময়ই তাকে তাড়া করে ফিরেছে।

ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার স্বপ্ন দেখেন সাবা। তিনি জানান, এটাই ছিল তার বাবার সবচেয়ে বড় চাওয়া। তার বিশ্বাস, একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি পেলে তার এই কঠোর পরিশ্রম পুরোপুরি সার্থক হবে। সাবার ৫২ বছর বয়সী মা ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ বলেন, সীমাহীন শোক ও অবর্ণনীয় কষ্টের পর এই সাফল্য তাদের কাছে এক বর্ণনাতীত আনন্দের।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *