স্বামী নেই, একমাত্র মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে ৪০ বছর পুরুষ হয়ে বাঁচেন তামিলনাড়ুর এই মহিলা

স্বামী নেই, একমাত্র মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে ৪০ বছর পুরুষ হয়ে বাঁচেন তামিলনাড়ুর এই মহিলা

পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে পেচিয়াম্মাল বলেন, পুরুষের পোশাক ও পরিচয় তাঁকে এমন সম্মান, নিরাপত্তা ওস্বাধীনতা দিয়েছে, যা একজন একাকী নারী হিসেবে তিনি কখনও পাননি।যাকে সারা জীবন ‘বাবা’ বলে ডেকেছে সন্তান, আজ তাঁকেই ডাকতে হবে ‘মা’ বলে— এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী বা হতে পারে সন্তানের কাছে? অথচ এ গল্প সিনেমার নয়, বাস্তবের এক্কেবারে জ্বলন্ত উপাখ্যান। গল্পের কেন্দ্রে তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) বাসিন্দা এস. পেচিয়াম্মাল।

পেচিয়াম্মালের বিয়ে হয়েছিল মাত্র ২০ বছর বয়সে। কিন্তু বিয়ের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় হৃদরোগে মারা যান তাঁর স্বামী শিবা। এদিকে, তারই মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন পেচিয়াম্মল। নির্দিষ্ট সময়ে জন্ম দিলেন কন্যা শানমুগাসুন্দরীকে, পেচিয়াম্মলের নিজের বয়স সে সময় মাত্র ২০। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম। সংসার চালাতে কখনও কয়লার কারখানায়, কখনও নির্মাণকাজে, আবার কখনও দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু আর্থিক কষ্টই তো আর একমাত্র বাধা নয়। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বা কাজের জায়গায় বারবার যৌন হয়রানি, কুপ্রস্তাব ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হত তাঁকে। একদিন এক ট্রাকচালক তাঁকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করলে, তিনি গভীরভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেই ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

‘পুরুষ জীবনের’ আগে ও পরে পেচিয়াম্মাল।
পরদিনই তিনি নিজের চুল কেটে ফেলেন, শাড়ির বদলে শার্ট ও ধুতি পরেন এবং নিজের নাম বদলে রাখেন ‘মুথু মাস্টার’। এরপর শুরু হয় এক নতুন জীবন। নতুন গ্রামের মানুষ তাঁকে পুরুষ হিসেবেই চিনতে শুরু করে। নিজের ভাব-ভঙ্গি, কথা বলার ধরন— সমস্ত কিছুই পুরুষদের মতো করে ফেলেন তিনি। এমনকী অন্য কর্মীদের সঙ্গ দিতে নিয়মিত বিড়ি খাওয়া শুরু করেন। দাঁতে দাঁত চেপে লুকিয়ে রাখেন ঋতুকালীন যন্ত্রণা। সরকারি নথিপত্রও বদলে ফেলেন। নারী পেচিয়াম্মল হয়ে ওঠেন পুরুষ মুথু। গল্পকথা মনে হলেও, সত্যি করেই এমনভাবে প্রায় ৪০ বছর কাটিয়ে দেন তিনি। সমাজের চোখে হয়ে ওঠেন এক সাধারণ পুরুষ।

শেষবয়সে নিজের আসল পরিচয় খুলে জানান তিনি। এক সাক্ষাৎকারে পেচিয়াম্মাল বলেন, পুরুষের পোশাক ও পরিচয় তাঁকে এমন সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা দিয়েছে, যা একজন একাকী নারী হিসেবে তিনি কখনও পাননি। তাঁর কথায়, এই পরিচয়ই তাঁকে মেয়েকে নিরাপদে বড় করে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে।

পেচিয়াম্মাল ওরফে মুথুর গল্পকে অনেকেই অসাধারণ সাহসের উদাহরণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায়। কেন একজন নারীকে নিরাপদে কাজ করতে এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে নিজের পরিচয় বদলাতে হবে? কেন সমাজ তাঁকে সেই নিরাপত্তা দিতে পারেনি? পেচিয়াম্মালের জীবন একজন নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে নারীরা প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য এবং হয়রানির মুখোমুখি হন।

আরও পড়ুন:

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *