ধানমন্ডি ৮ নম্বর লেক ব্রিজের পাশে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসেন তিনি। পথচারী আর আশপাশের বাসিন্দাদের কাছে জায়গাটা ‘কোহিনূরের মেহেদি পয়েন্ট’ নামে পরিচিত।
কয়েক মাস আগেও এই নারী ভিক্ষা করেই জীবন চালাতেন। তবে প্রতিবন্ধী ভাসমান এই নারী এখন নিজের হাতে মেহেদি পাতা বাটাসহ, তাজা পাতাও বিক্রি করে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে নিয়েছেন। নাম তার কোহিনূর।
মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই, নেই নিজের কোনো ঘর।
তবু তিনি বলেন, “এই লেকপাড়ই এখন আমার ঘর-বাড়ি। সারাদিন এই খানেই থাহি। ভিক্ষা করত্তে আর চাই না, তাই নিজের ইচ্ছাত কাজ করতাছি। পা অচল, কাম করে না। কিন্তু হাত তো আছে। এই হাত দিয়াই আয় কইরা খাই।”
শখ থেকেই আয়ের শুরু
পুরান ঢাকায় জন্ম নেওয়া কোহিনূরের জীবন সহজ ছিল না। প্রায় বিশ বছর আগে মারা যান স্বামী। একটি মেয়ে থাকলেও, তার কাছে থাকেন না।
প্রতিকূল জীবনে ধানমন্ডি এলাকায় এসে ভাসমান জীবন শুরু করেন। প্রায় দশ বছর ভিক্ষা করেই দিন কাটিয়েছেন। তবে আয়ের চেয়ে বেশি মিলত অসম্মান। তাই মনের শান্তি কখনই ছিল না কোহিনূরের।
চার থেকে পাঁচ মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেহেদি বিক্রির একটি ভিডিও চোখে পড়ে তার। তখনই মনে চিন্তা আসে ছোটবেলা থেকেই মেহেদি বেটে চুলে আর হাতে দিতে ভালোবাসেন আবার আশপাশের অনেক নারীকেও শখ করে বেটে দেন।
তাহলে এটাকেই কেন পেশা বানানো যাবে না?
প্রথম দিনের তিনশ টাকা থেকে হাজার টাকার আয়
প্রথম দিন হাতে যা টাকা ছিল তা দিয়ে মাত্র ৩০০ টাকার মেহেদি পাতা কিনেছিলেন কোহিনূর। সব বিক্রি করে সেদিনই প্রায় ৩০০ টাকা লাভ হয়। সেই ছোট সাফল্যই তাকে সাহস দেয়।
যদিও রোজার ঈদের পরে ১ মাস মেহেদি বাটার কাজ করতে পারেনি আশপাশের নানান ঝামেলায়।
এখন প্রতিদিন তিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার তাজা মেহেদি পাতা কেনেন। সেই পাতা বেটে ছোট ছোট কাপে ভরে বিক্রি করেন।
পাশাপাশি তাজা পাতার ছোট ছোট আঁটিও পাওয়া যায় তার কাছে।
এক কাপ বাটা মেহেদির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা। আর এক আঁটি তাজা পাতা বিক্রি করেন ২০ টাকায়।
তিনি বলেন, “আপারা বাটা মেহেদিই বেশি কেনেন। কারণ পাটায় মেহেদি বাটা অনেক কঠিন কাম। অল্প পাতা বাটলে তা পাটাতেই লাইজ্ঞা থাহে।”
প্রতিদিন গড়ে আয় হয় ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ভিক্ষা করার সময়ও এই পরিমাণ আয় হত না তার।
দিন শুরু হয় রায়েরবাজার থেকে
কোহিনূরের প্রতিটি দিন শুরু হয় রায়েরবাজার থেকে। সেখান থেকে তিনি তাজা মেহেদি পাতা সংগ্রহ করেন। শুধু একবার নয়, সকালে এবং রাতে, দুই দফায় পাতা কিনতে যান, যাতে সব সময় ক্রেতাদের হাতে তাজা পাতা তুলে দিতে পারেন।
এরপর শিলপাটায় নিজ হাতে পাতা বেটে তৈরি করেন মেহেদি।
আধুনিক যন্ত্র যতই আসুক, বহু পুরানো শিলপাটাই পাতা বাটার জন্য ভালো মনে করেন কোহিনূর।
প্রথমে নিজের কাছে থাকা ছোট পাটায় পাতা বাটতেন।
তার কথায়, “প্রথমে অনেক কষ্ট হইত, কারণ পাটা ছোট আছিল। তাই অল্প অল্প পাতা বাটতে হইত। পরে লেকে হাঁটনের সময়ে এক ভাইয়া আমারে দেইখা একটা বড় পাটা কিইন্না দিসে।”
বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা
সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিন বিক্রি তুলনামূলক কম হয়। তবে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার তার খোলা দোকানে ভিড় থাকে বেশি। লেকপাড়ে বেড়াতে আসা মানুষ, আশপাশের বাসিন্দা এবং মেহেদিপ্রেমী নারীরাই তার প্রধান ক্রেতা।
সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত, ধানমন্ডি ৮ নম্বর লেকের ব্রিজের পাশেই বসে থাকেন। দিন শেষে শরীর ক্লান্ত থাকলেও তার মুখে থাকে তৃপ্তির হাসি। কারণ এই আয় নিজের পরিশ্রমের।
মানুষের সহায়তায় দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প
কোহিনূরের এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু তার ইচ্ছাশক্তিই নয়, রয়েছে ধানমন্ডি লেকপাড়ের অনেক মানুষের সাহায্য।
কেউ তাকে একটি শিলপাটা কিনে দিয়েছেন। কেউ প্রথম দিকে মেহেদি কিনে সাহায্য করেছেন। আবার কেউ ব্যবসার পরিচিতি বাড়াতে তৈরি করে দিয়েছেন সাইনবোর্ড।
সেখানে লেখা আছে তার ফোন নম্বর। তাই চাইলেই আগে থেকে ফোন করে তাকে অর্ডার করে রাখা যাবে।
কোহিনূর মনে করেন, ছোট ছোট সহযোগিতাগুলোই ভিক্ষা ছেড়ে তাকে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দিয়েছে।

