স্ত্রীর দেওয়া কিডনিতে জীবন পাওয়া সেই নাদিম আর নেই

স্ত্রীর দেওয়া কিডনিতে জীবন পাওয়া সেই নাদিম আর নেই

সাভারের আশুলিয়ার ববিতা আক্তার (ববি) ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছিলেন নিজের শরীরের একটি অঙ্গ দান করে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা স্বামী নাদিম মন্ডলকে বাঁচাতে তিনি দুবছর আগে নিজের একটি কিডনি দিয়েছিলেন। সেই কিডনিতে দ্বিতীয় জীবন পেয়েছিলেন নাদিম। কিন্তু দ্বিতীয় জীবনও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ হলো না তার।

প্রায় দুই বছর আগে ছিনতাইকারীদের হামলায় স্ত্রী ববিতাকে হারানোর পর থেকে নাদিম শুধু একা বেঁচেছিলেন, জীবনকে আর আগের মতো করে বাঁচাতে পারেননি তিনি। একদিকে দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতা, অন্যদিকে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর অসহনীয় শূন্যতা, দুটোই তাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।

স্বজনদের দেওয়া তথ্য মতে, শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নাদিম মন্ডল।

নাদিম ও ববিতার সংসারের গল্প একসময় আশুলিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়েছিল। চিকিৎসকরা যখন জানিয়ে দিয়েছিলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া নাদিমকে বাঁচানো সম্ভব নয়, তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের একটি কিডনি দান করেন স্ত্রী ববিতা। সফল অস্ত্রোপচারের পর নতুন জীবন ফিরে পান নাদিম। পরিবারের মানুষ ভেবেছিলেন, এবার হয়তো দুঃসময় কেটে যাবে। কিন্তু নিয়তি যেন তাদের জন্য লিখে রেখেছিল এক ভিন্ন সমাপ্তি।

কিডনি দেওয়ার মাত্র ছয় মাস পর সাভারে ছিনতাইকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন ববিতা। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি মারা যান। যে মানুষটি নিজের শরীরের একটি অংশ দিয়ে স্বামীকে বাঁচিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই আর বাঁচানো যায়নি।

ববিতার মৃত্যুর পর নাদিমের জীবন বদলে যায়। স্বজনদের ভাষ্য, তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিলেও মানসিকভাবে আর কখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। স্ত্রীর স্মৃতি, শারীরিক দুর্বলতা এবং একের পর এক চিকিৎসা, এই ছিল তার জীবনের শেষ দুই বছরের গল্প।

প্রতিবেশীরা বলেন, নাদিমের মুখে প্রায়ই শোনা যেত স্ত্রীর কথা। কেউ খোঁজ নিতে এলে তিনি বলতেন, ‘ও না থাকলে আমি তো আগেই চলে যেতাম।’ সেই কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় সত্য।

স্থানীয়দের মতে, ববিতা ও নাদিমের জীবন কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি আত্মত্যাগ, ভালোবাসা এবং জীবনের অনিশ্চয়তার এক মর্মস্পর্শী দলিল। যে নারী নিজের একটি কিডনি দিয়ে স্বামীকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছিলেন, সেই জীবনও শেষ পর্যন্ত বেশিদিন টিকল না।

আজ তাদের দুজনই নেই। কিন্তু তাদের গল্প রয়ে গেছে-ভালোবাসার সংজ্ঞা নতুন করে শেখানো এক দম্পতির গল্প হিসেবে। এমন এক গল্প, যেখানে একজন স্ত্রী নিজের জীবন বাজি রেখে স্বামীকে বাঁচিয়েছিলেন, আর সেই স্বামী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়িয়েছেন সেই ভালোবাসার স্মৃতি।

এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, স্বামী-স্ত্রীর এই ঘটনাটি হৃদয়স্পর্শী। বিষয়টি শুনেছি। তবে স্বজনদের দিক থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ না থাকায় পুলিশের করণীয় কিছুই ছিল না।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *